হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কালাম, তাফসির, হাদিস ও মনোবিজ্ঞানের বিশেষায়িত জ্ঞানসমূহে অগ্রগামী ও শীর্ষস্থানীয় হাওজা” শীর্ষক এ বৈঠকটি অনলাইনে এবং হাওজা ইন্টারনেট টেলিভিশনে সম্প্রচারের মাধ্যমে, কোমের কুরআন ও হাদিস গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের শুরুতে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন সাইয়্যেদ মুহাম্মদ কাজেম তাবাতাবাই, হাদিস বিজ্ঞান ও মাআরিফ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান, বলেন: কোমের হাওজায়ে ইলমিয়ার পুনঃপ্রতিষ্ঠার শতবর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সময় বহু কাজ সম্পাদিত হয়, যা বিশেষত মৌলিক হাওজাভিত্তিক জ্ঞানসমূহ পুনরালোচনার সুযোগ করে দেয়।
হাদিস বিজ্ঞান ও মাআরিফ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান আরও বলেন: কুরআন ও সুন্নাহ অন্যান্য সব জ্ঞানের ভিত্তি; এ কারণেই ভবিষ্যতের অগ্রগামী হাওজায় কুরআন ও হাদিসের অবস্থানকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন: বিপ্লবের শহীদ নেতা তাঁর “অগ্রগামী ও শীর্ষস্থানীয় হাওজা” বার্তায় হাওজায়ে ইলমিয়াকে এমন এক কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা অতীতে থেমে থাকেনি এবং মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের জবাব দিতে সক্ষম। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, অগ্রগতির জন্য হাওজায়ে ইলমিয়ার বৈজ্ঞানিক মানোন্নয়ন এবং বিশ্বের আধুনিক অর্জনের প্রতি মনোযোগ অপরিহার্য।
“অগ্রগামী ও শীর্ষস্থানীয় হাওজা” ঘোষণাটি শহীদ নেতার চিন্তন ও ভবিষ্যৎ-পর্যালোচনার ফল / হাওজা অতীতে থেমে থাকেনি
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন তাবাতাবাই সামাজিক ব্যবস্থাগুলোর প্রতিষ্ঠায় কুরআন ও সুন্নাহর ভূমিকার প্রসঙ্গে বলেন: কুরআন ও সুন্নাহকে জ্ঞানভাণ্ডারের মূল স্তম্ভ হিসেবে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত; আর এ ক্ষেত্রে হাদিস, কুরআনের ব্যাখ্যা এবং দু’টি ভারী আমানতের অন্যতম হিসেবে, বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, হাদিসবিজ্ঞান ইসলামী জ্ঞানের জননীস্বরূপ। তিনি বলেন: হাদিস কেবল একটি সহায়ক বিদ্যা নয়; বরং কুরআন ও হাদিসই চিন্তা উৎপাদন ও সভ্যতা নির্মাণের মূল উৎস। হাদিসকে শুধু প্রাচীন ও ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং সেটিকে ইসতিনবাত বা বিধান-উৎপাদনের এক জীবন্ত উৎস হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
হাদিস বিজ্ঞান ও মাআরিফ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বলেন: হাদিসবিজ্ঞানের গুরুত্ব সত্ত্বেও অতীতে এ বিষয়ে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়নি; বরং এটি সর্বদা ফিকহের ছায়ায় ছিল। হাদিসকে ফিকহকেন্দ্রিক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে এবং এর প্রামাণ্যতা যাচাইও উসূলুল ফিকহের ছায়ায় পরিচালিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন: কুরআন ও বর্ণনা থেকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সমন্বিত তত্ত্ব আহরণ করতে হলে হাদিসকে একমাত্রিকভাবে দেখা চলবে না; বরং হাদিস ও আয়াতসমূহকে সমষ্টিগতভাবে বিবেচনায় নিয়ে সেখান থেকে সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিছু পূর্বশর্তও রয়েছে।
প্রথম আবশ্যিকতা:
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন তাবাতাবাই বলেন: বর্তমানে হাদিস শাস্ত্রে যে প্রামাণ্যতা যাচাই (Validation) প্রচলিত আছে, তা এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যকর নয়। কারণ অতীতে হাদিস ছিল ফিকহ শাস্ত্রের একটি উপশাখা মাত্র। ফকিহগণ হাদিসের দিকে কেবল রিজাল (হাদিসের বর্ণনাকারীদের জীবনী) বা ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে তাকাতেন, যার ফলে হাদিস সবসময় ফিকহের ছায়াতলে এবং এর প্রামাণ্যতা কেবল ‘উসূলুল ফিকহ’-এর ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। এ কারণেই হাদিস যাচাইয়ের প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
দ্বিতীয় আবশ্যিকতা:
হাদিস বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান হাদিস ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিদ্যা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন: আমাদের ‘ফিকহুল হাদিস’, ‘উসূলুল হাদিস’ এবং ‘উসূলু ফিকহিল হাদিস’ শাস্ত্রগুলো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘উসূলুল ফিকহ’ এবং ‘উসূলু ফিকহিল হাদিস’-এর মধ্যে কিছু সাধারণ মিল থাকলেও এগুলো একে অপরের থেকে ভিন্ন। হাদিস যাতে আজকের সমাজের সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে পারে, সেজন্য এগুলোর প্রতি আরও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
তৃতীয় আবশ্যিকতা:
তিনি হাদিস পাঠ ও হাদিস অনুধাবনের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে যোগ করেন: হাওজায়ে ইলমিয়াহর শিক্ষাক্ষেত্রেও হাদিস বিজ্ঞানের প্রতি মনোযোগ বাড়ানো উচিত। কারণ হাদিসের প্রতি ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি থাকার ফলে ফিকহী বর্ণনাগুলো কেবল ফিকহী আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীরা নৈতিক বা অন্যান্য হাদিসের মুখোমুখি হলেও সেগুলোকে ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিচার করার চেষ্টা করে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন তাবাতাবাই জোর দিয়ে বলেন: উচ্চতর শিক্ষা পর্যায়ে (সাতহ ও খারিজ) শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। যেমনভাবে আমাদের ‘খারিজ ফিকহ’ বা ‘খারিজ কালাম’ আছে, তেমনি ‘উসূলুল ফাহম’ বা ‘উসূলু ফিকহিল হাদিস’, ‘খারিজ রেওয়ায়াতি আখলাকি’ এবং ‘খারিজ রেওয়ায়াতি মারিফাতি’-এর মতো বিষয়গুলোকেও আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করতে হবে।
চতুর্থ আবশ্যিকতা:
তিনি বলেন: আরেকটি অন্যতম প্রয়োজন হলো বিশেষায়িত হাদিস ও ফিকহুল হাদিস গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা। যদিও হাদিস নিয়ে কাজ করার মতো কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তবে আমাদের আরও স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্রের প্রয়োজন।
হাদিস গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান আরও জোর দেন যে, কুরআন ও হাদিস হচ্ছে মূল উৎস। এগুলোকে অন্য শাস্ত্রের (যেমন: মানবিক বিদ্যা) সাথে যুক্ত করতে এবং ব্যবহারের জন্য আমাদের আন্তঃবিভাগীয় কোর্স বা শাখার প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন: ‘উসূলুল ফিকহ’ এবং হাদিসের বিষয়গুলোকে স্বতন্ত্র বিদ্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের কাছে হাদিসের প্রামাণ্যতা যাচাইয়ের সম্পদ রয়েছে। আমরা যদি হাদিসের একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাদিস সংকলনসমূহ পর্যালোচনার জন্য বড় বড় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে তারা সিস্টেম-নির্মাণ মডেল তৈরি করে তা বৈজ্ঞানিক সমাজের কাছে উপস্থাপন করতে পারে।
পঞ্চম আবশ্যিকতা:
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন তাবাতাবাই বলেন: এক সময় ডিজিটালকরণের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রগামী ছিলাম, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আসার পর আমরা এই পথে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। পশ্চিমা বিদ্যাচর্চায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শক্তিশালী হলেও, হাদিসের বয়ান বা তথ্যের ক্ষেত্রে তা দুর্বল। এ কারণে এই ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব ও দেশীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
ষষ্ঠ আবশ্যিকতা:
তিনি হাদিস শাস্ত্রে হাওজার অন্তর্মুখী প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন: হাদিস নিয়ে এখন পর্যন্ত যা কিছু কাজ হয়েছে, তা মূলত হাওজার ভেতরই সীমাবদ্ধ। এ কারণেই পশ্চিমা গবেষণা এবং সুন্নি বিশ্বের গবেষণায় শিয়াদের কাজের প্রতি খুব কমই উল্লেখ পাওয়া যায়। আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে। আর এটি অর্জনের জন্য হাদিস বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুবাদ আন্দোলনকে শক্তিশালী করা এবং হাওজার বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। যদি এটি করা সম্ভব হয়, তবে আমরা সমাজ ও বিশ্বের চাহিদাকে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারব।
আপনার কমেন্ট